সাফল্য গাঁথা
সাফল্য গাঁথা
আলোর পথের অভিযাত্রী
দরিদ্র্য বাবার জ্যেষ্ঠ সন্তান, উখিয়ার কিশোরী নূর আয়েশা বেগম (১৮), পাঁচ ভাইবোনের বৃহৎ পরিবারে বেড়ে উঠেছেন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। উত্তরাধিকারসূত্রে তার পরিবারের কোন জমি না থাকায় পাহাড়ের ধারে একটি ছোট্ট জমিতে বসবাস করে আসছিলো তারা। চরম আর্থিক অনটনের মধ্যেও নূর তার পড়াশোনা চালিয়ে যায় এবং কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলায় অবস্থিত সোনাইছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী ছাত্রী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলে।
নূর আয়েশার দিনমজুর বাবার পক্ষে তার সামান্য আয় দিয়ে এত বড় পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা ই অসম্ভব ছিল, তাই নূর এবং তার ছোট ভাইবোনদের শিক্ষার খরচ চালানো পরিবারের জন্য অসহনীয় বোঝা বলে প্রতিভাত হয়। যেহেতু নূরের পরিবারের বিকল্প আয়ের কোনও নির্ভরযোগ্য উৎস ছিলনা, তাই তারা গভীর সংকটময় অবস্থায় দিনাতিপাত করছিল।
নূর এবং তার পরিবার আশার আলো দেখতে পায় যখন মুক্তি কক্সবাজার ২০২৫ সালের মে মাসে, তাদের Skills for Hope, Independence and Empowerment (SHINE) প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের উদ্যোগে নূর আয়েশা বেগমকে প্রকল্প-অংশগ্রহনকারী হিসেবে নির্বাচিত করে। সেই সময়, নবম শ্রেণির ছাত্রী নূরের সবজি চাষ সম্পর্কে জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। SHINE তাকে প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং ইনপুট সহায়তা হিসেবে সকল ধরণের প্রয়োজনীয় কৃষি সরঞ্জাম সরবরাহ করে।
প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর, সেচ সুবিধার অভাব থাকা সত্ত্বেও, নূর আয়েশা তার বাড়ির আঙিনায় Sack Method পদ্ধতি অবলম্বন করে সবজি চাষ শুরু করেন। সে নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি বাগানের যত্ন নিতো এবং অবশেষে, তার অধ্যবসায় সার্থক হয় যখন তার সবজি বাগানে প্রথম দফা সবজি জন্মাতে শুরু করে।
SHINE প্রকল্প নূর ও তার পরিবারকে নিজের বাগানে উৎপাদিত সবজি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণের মাধ্যমে খাদ্যে-বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করেছে। নূর এখন স্থানীয় বাজারে উদ্বৃত্ত সবজি বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের দ্বারা তার ছোট বোনের পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার খরচ বহন করছে এবং তার বাবার উপর খরচের চাপ কমাতে সাহায্য করেছে।
নূর আয়েশা বেগম তার সাফল্যে গর্বিত বোধ করে। তার উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এছাড়াও, একজন মেয়ে হিসেবে, সে এখন তার পরিবারের খরচ বহনে সরাসরি অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তার যাত্রা এলাকার অন্যদেরকে আত্মবিশ্বাসী হতে এবং নিরাপদ জীবন গড়ার জন্য সাহসী হতে অনুপ্রাণিত করেছে।
“এখন আমি অন্যদের অধিকার আদায়ের কথা বলি।"
কক্সবাজারের উখিয়ার এক দরিদ্র অটোরিকশা চালকের মেয়ে মোহসেনা আরা (২৪) তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। চরম আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, তিনি এসএসসি পাস করেন এবং পরে পারিবারিক চাপের কারণে বিয়ে করতে বাধ্য হন। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এই যে, বিয়ের পর মোহসেনা তার স্বামীর দ্বারা অবহেলা, অত্যাচার, এবং অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
কোন সন্তান না থাকায়, সমাজে তাকে আরও বেশী হয়রানির শিকার হতে হয় এবং অবশেষে তার বিবাহ ভেঙে যায়। বিবাহবিচ্ছেদের পর, তিনি তার পিতামাতার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু বিধিবাম! এখানেও তিনি পরিবার ও সমাজের তীব্র অবহেলা, একাকীত্ব এবং মানসিক আতঙ্কের শিকার হন যা তাকে ক্রমান্বয়ে গ্রাস করতে থাকে। যার ফলে, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও হীনমন্যতায় তিনি নিজেকে সকল ধরণের সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন এবং হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন।
জীবনের এই কঠিন পরিস্থিতিতে, মুক্তি কক্সবাজারের Skills for Hope, Independence and Empowerment (SHINE) প্রকল্প কর্তৃক আয়োজিত "Soft Skills (লিডারশিপ, কমিউনিকেশন অ্যান্ড নেগোসিয়েশন)" প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ মোহসেনাকে তার জীবনের মোড় ঘুরাতে সাহায্য করে। এই প্রশিক্ষণ তাকে নারী হিসেবে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে, তার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। ফলশ্রুতিতে, তিনি আত্মবিশ্বাসী এবং স্পষ্টভাষী হয়ে ওঠেন। এক নতুন উদ্যমের সাথে তিনি তার পরিবার এবং কমিউনিটির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন।
মোহসেনা এখন তার নিজ এলাকার একজন স্বীকৃত নারী নেত্রী। তিনি এখন স্থানীয় নারীদের জন্য নিয়মিত আলোচনা সভা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করেন, কিশোরী মেয়েদের শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী হতে উদ্বুদ্ধ করে তরুন-তরুনীদের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করেন, সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তা করেন, সহিংসতায় আক্রান্ত নারীদের পরামর্শ ও মানসিক সহায়তা প্রদান করেন এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
মোহসেনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনেক সুদূরপ্রসারী। তিনি একজন দক্ষ নেত্রী হতে চান এবং তার কমিউনিটির মধ্যে একটি “নারী সহায়তা দল” গঠন করতে চান। তার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হল সমাজসেবাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া এবং নারী অধিকার ও সুরক্ষা সম্পর্কিত বিষয়গুলিতে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করা। তার এই ইতিবাচক পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ: -
"আগে আমি নিজের কথা বলতেও ভয় পেতাম,
এখন আমি অন্য নারীদের পক্ষে কথা বলি - এটাই আমার শক্তি।"
SHINE প্রকল্পের লিডারশিপ, কমিউনিকেশন এবং নেগোসিয়েশনের উপর প্রাপ্ত প্রশিক্ষণ মোহসেনাকে কেবল একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে এমন নয়, বরং তিনি তার কমিউনিটির নারীদের কাছে হয়ে উঠেছেন ইতিবাচক পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
জেসমিনের আশা ও দৃঢ়তার গল্প
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অপর্যাপ্ত অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা ও ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে সেখানে বসবাসরত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন, শিক্ষাগ্রহণ এবং আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হতে হয়। UNFPA’র সহায়তায় মুক্তি কক্সবাজার পরিচালিত Adolescent & Youth প্রকল্প, কিশোর এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য জীবনমুখী শিক্ষা ও দক্ষতা, সুরক্ষা এবং সাক্ষরতা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এইসকল বাধা দূরীকরণে কাজ করে থাকে।
এফডিএমএন ক্যাম্প-১১-এর একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কিশোরী জেসমিন, বাক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করার চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠে শিক্ষাগ্রহণের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করেছে সে। মুক্তি কক্সবাজারের “গার্ল শাইন সেশন” এবং “ফাংশনাল লিটারেসি প্রোগ্রাম” উদ্যোগের সহায়তায়, সে শিক্ষাগ্রহণ করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে নিজের সম্ভাবনা প্রকাশের নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে।
বাক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা জেসমিন কথা বলতে না পারার কারণে কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারতোনা। যার ফলে দিন দিন তার আত্মবিশ্বাস মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছিলো এবং সে নিজেকে গুঁটিয়ে নিচ্ছিল। একেতো যথাযথ শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ-স্বল্পতা, তার উপর তার নিজ কমিউনিটি থেকে কোনধরণের সহায়তা না পাওয়ায় তার দক্ষতা বিকাশ বা একাকীত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায়ও ছিল না।
জেসমিনের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয় ২০২২ সালে। যখন জেসমিন মুক্তি কক্সবাজার কর্তৃক বাস্তবায়িত IMHM প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত গার্ল শাইন সেশনের একজন নিয়মিত অংশগ্রহণকারী হিসেবে যোগদান করে। এই সেশন তাকে জীবনমুখী বিভিন্ন দক্ষতায় দক্ষ করে তোলে এবং অন্যান্য কিশোর-কিশোরীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করতে সহায়তা করে। ইতিবাচক ও সহায়ক পরিবেশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, জেসমিন পরবর্তীতে প্লেসমেন্ট পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর “ফাংশনাল লিটারেসি প্রোগ্রামে” ভর্তি হয়।
মুক্তি কক্সবাজারের “ফাংশনাল লিটারেসি প্রোগ্রামের” মাধ্যমে, জেসমিন মৌলিক সাক্ষরতার পথে অনেকদূর এগিয়ে যায় সে। এই প্রোগ্রাম তাকে সংখ্যা, অক্ষর এবং অন্যান্য দক্ষতা শিখতে সহায়তা করে। বাক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও, সে তার শিক্ষকের ঠোঁটের নড়াচড়া মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে এবং অক্ষর এবং শব্দ উচ্চারণ অনুশীলন করে। তার নিষ্ঠা, শেখার প্রতি একাগ্রতা এবং অধ্যবসায়ের দ্বারা সে তার চিন্তাভাবনা আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে শেখে।
জেসমিন সাক্ষরতা এবং সামাজিক যোগাযোগ উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। যদিও তার কথাবার্তা এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, কিন্তু সে এখন তার চিন্তাভাবনা আরও সাবলীলভাবে প্রকাশ করতে পারে এবং আশেপাশের লোকেরা তাকে আরও ভালভাবে বুঝতে পারে। জেসমিনের শিক্ষক বলেন যে, সে যে কেবল নিজের শেখার উপর মনোযোগী ছিল তা ই নয়, বরং হাতের লেখার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়া অন্যান্য সহপাঠীদেরও সে উৎসাহিত করতো। জেসমিনের মা বলেন যে তার মেয়ে এখন প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে - যা সে আগে কখনও করেনি। জেসমিনের মা বললেন:
“সে সবসময় চুপচাপ থাকত।
এখন, সে হাসে, কথা বলে এবং অন্যদের সাহায্য করার চেষ্টা করে।
আমি তার জন্য গর্বিত।”
জেসমিনের আত্মবিশ্বাসের পথে এই সফল যাত্রা প্রমাণ করে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং আন্তরিক সহায়তা অনায়াসে প্রতিবন্ধী কিশোরী মেয়েদের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।