সাফল্য গাঁথা
সাফল্য গাঁথা
তারা ভেবেছিল স্বপ্ন দমিয়ে রাখা যায়!
কক্সবাজার জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাস করে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের পঞ্চম সন্তান হালু (ছদ্মনাম)। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা হালুকে তার এলাকায় "ল্যাংড়া হালু" নামে উত্যক্ত করা হতো। সীমিত শিক্ষা, তার প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সামাজিক কুসংস্কার, আর দশটা মানুষের থেকে শারীরিকভাবে আলাদা হয়ে জন্মানোর নীরব যন্ত্রণা এবং তার কমিউনিটির মানুষের অবিরাম উপহাস একজন নারী হিসেবে তার জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিলো।
২০ বছর বয়সে, দৈনিক পারিশ্রমিকে কাজ করা একজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন হালু। অবশেষে, তিনি এই বিবাহের মধ্য দিয়ে ভালোবাসা, স্বীকৃতি, গ্রহণযোগ্যতা এবং শান্তির আশা করেছিলেন। যদিও ভাগ্যের হয়তো অন্য পরিকল্পনা ছিলো, কয়েক বছর যেতে না যেতেই, যখন তিনি একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন, তখন হালুর স্বামী তাকে পরিত্যাগ করে অন্য একজন নারীকে বিয়ে করেন। ভগ্ন হৃদয় ও নিঃস্ব হয়ে হালু তার পিতামাতার ছোট্ট বাড়িতে ফিরে আসেন যেখানে তাকে তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে সাথে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হতো প্রতিনিয়ত।
এত বিপদসংকুলতা সত্ত্বেও, হালু তার মেয়েকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ঘর-গৃহস্থালির কাজকর্ম করতো। দূর্ভাগ্যবশত, তিনি মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন, কিন্তু তিনি শেখা বা স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে কখনও পিছপা হননি। হালু জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসে Girls Get Equal 2.0 (GGE 2.0) প্রকল্পের Youth Economic Empowerment Program।
বর্তমানে ৩৮ বছর বয়সী হালু মুক্তি কক্সবাজার কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন GGE 2.0 প্রকল্পেরYouth Economic Empowerment Program-এ যোগদান করেছেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মুক্তি কক্সবাজার হালুর মতো প্রান্তিক নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে যাতে তারা তাদের নিজ-উদ্যোগে উন্নত জীবন গড়ার জন্য উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠে।
হালুর মেয়েটির বয়স এখন ১৩ বছর, প্রতিশ্রুতি ও সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ তার চোখ। হালু স্বপ্ন দেখে যে তার মেয়ে এমন একজোড়া ডানা নিয়ে বড় হবে যা হালু নিজে কখনও পায়নি - তার মেয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করবে এবং স্বাধীনতা ও মর্যাদার সাথে জীবনযাপন করবে। প্রতিটি ঝড়ের মধ্যেও অবিচলিত হালু সাহস ও আশা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
মানবিক সংস্থা হিসেবে হালুর মতো প্রকল্প-অংশগ্রহণকারীদের পাশে দাঁড়াতে পেরে মুক্তি কক্সবাজার গর্বিত। যাদের আত্মবিশ্বাস দৃঢ়, জীবনযুদ্ধে যারা কখনো হাল ছাড়ে না, তারা নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি কমিউনিটির জন্য উদাহরণ স্থাপন করে।
হাসি ফিরেছে সোলিমানের মুখে!
২০১৭ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সময় বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ০৪ সন্তানের মা সোলিমান খাতুন (২৮) ক্যাম্প-০৪-এ বসবাস করছেন। ০৭ জনের বিশাল পরিবার (তার বোনও তার সাথে বসবাস করে) এবং নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস না থাকায়, সোলিমান খাতুন এবং তার পুরো পরিবারকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হতো। যদিও সে কাজ করতে ইচ্ছুক ছিলো, কিন্তু সুযোগের অভাব এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে তারা সম্পূর্ণরূপে সাহায্যকারী দাতা-সংস্থাগুলির উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছিলো। তবে দাতা-সংস্থা প্রদত্ত খাদ্য-সহায়তায় প্রায়শই তাজা শাকসবজি অনুপস্থিত থাকতো, যার ফলে তাদের পরিবারে খাদ্য এবং পুষ্টি-বৈচিত্র্য বলতে কিছুই ছিলোনা।
যদিও মায়ানমারে থাকাকালীন সোলিমান বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করতো, কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা না থাকার কারণে সে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তা করতে পারেনি। সোলিমান সবজি চাষের মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলো, এবং তার ইচ্ছাশক্তিও দৃঢ় ছিলো। কিন্তু ক্যাম্পে তার কোনো সুযোগ বা পৃষ্ঠপোষকতা ছিলোনা। তিনি বলেন, "আমি মায়ানমারে আমার বাড়ির উঠোনে সবজি চাষ করতাম, কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় এখানে আমি তা পারি না।”
সোলিমানের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুর নিয়ে আসে অক্সফাম বাংলাদেশের অংশীদারিত্বে মুক্তি কক্সবাজার বাস্তবায়িত “Strengthening Livelihood capacity and increased Food Security of Rohingya and Host Communities through climate adaptive technology (SLFS)” প্রকল্প। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, তিনি এই প্রকল্পের অধীনে একজন প্রকল্প-অংশগ্রহণকারী হিসেবে নির্বাচিত হোন। SLFS প্রকল্পের বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি বাগান উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জলবায়ু-অভিযোজনক্ষম সবজি চাষ কৌশল (যেমনঃ বস্তা পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উল্লম্ব পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং বহুস্তরবিশিষ্ট বাগান পদ্ধিতসহ আরও অনেক), জৈব পদ্ধতি অবলম্বনে সবজি চাষাবাদ, বালাই ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, কম্পোস্ট সার তৈরি, এবং ছোট জায়গায় সবজি বাগান স্থাপনের প্রশিক্ষণসহ আরও অনেক।
এছাড়াও, প্রকল্পটি বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি বাগান স্থাপন ও সবজি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ধরণের উপকরণ সহায়তা (হোমস্টেড কিট, জলবায়ু-অভিযোজনক্ষম ফসলের বীজ ও চারা, ফেরোমন ফাঁদ, এবং স্টিকি ট্র্যাপ) প্রদানের মাধ্যমে “কালিকাপুর মডেল” ব্যবহার করে বছরব্যাপী তাকে সবজি চাষে সক্ষম করে তোলে।
SLFS-এর এই সহায়তায়, সোলিমান তার শেল্টারের কাছে স্থাপিত হোমস্টেড বাগানে সফলভাবে সবজি চাষ করেছেন। তিনি এখন তার বৃহৎ পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে তাজা এবং ক্ষতিকারক কীটনাশক ও রাসায়নিক উপাদানমুক্ত টমেটো, লাউ, এবং মরিচের মতো দরকারী সবজি ফলাচ্ছেন। প্রকল্প কর্তৃক প্রদত্ত রান্না-প্রদর্শনী থেকে নিয়েছেন পরিবারের পুষ্টি চাহিদা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পারিবারিক পুষ্টি বজায় রেখে রান্না সম্পর্কে সচেতন থাকা তার সন্তানদের স্বাস্থ্য বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাকে প্রকল্প-অংশগ্রহণকারী হিসেবে চিহ্নিত করে সবজি বাগান স্থাপনে সহায়তা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সরবরাহ করায় মুক্তি কক্সবাজারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি। সোলিমান খাতুন বলেন:
“এই হোমস্টেড বাগানটি কেবল একটি বাগান নয়, বরং আমার জন্য একজন অভিভাবক;
এই বাগানের মাধ্যমে আমাদের সকলের খাদ্য সরবরাহ হচ্ছে।”
মুক্তি কক্সবাজারের SLFS প্রকল্পের এই জলবায়ু-সহনশীল সবজি বাগান মডেলটি সীমাবদ্ধ জমির কারণে উদ্ভূত সকলধরণের অসুবিধা কমিয়ে, ফেরোমন এবং স্টিকি ফাঁদসহ পরিবেশ-বান্ধব কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করে, এবং রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে একটি টেকসই ও কার্যকর ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে।
সোলিমান খাতুন তার কমিউনিটির কাছে একজন উদাহরণে পরিনত হয়েছেন। এখন তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বেদনা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের ভবিষ্যৎ গঠনে অন্যদের উৎসাহিত করছেন। তিনি তার প্রশিক্ষণ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান তার কমিউনিটির অন্যদের মাঝেও বিলিয়ে দিচ্ছেন, এমনকি, অন্যকেউ কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে তাদের সাহায্য করছেন।