সাফল্য গাঁথা
সাফল্য গাঁথা
পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক আনোয়ার কলি!
আনোয়ার কলি (২১), ক্যাম্প-০১ ইস্ট-এ বসবাসকারী এক রোহিঙ্গা তরুণী, কক্সবাজারের জনাকীর্ণ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের অন্যান্য তরুণীদের মতো তার জীবনও সংগ্রাম ও অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। তিনি তার মা, এক বড় ভাই এবং এক ছোট বোনের সাথে থাকেন। ছোটবেলা থেকেই কলি নাচ, গান এবং খেলাধুলা ভালোবাসতেন। কিন্তু পারিবারিক জীবনে আসা আকস্মিক পরিবর্তন নাটকীয়ভাবে তার শৈশবকে বদলে দেয়।
যখন কলির বয়স চৌদ্দ, তখন তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং এর কিছুদিন পরেই নতুন পরিবার নিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান। এতে কলির পরিবার গভীর সংকটে পড়ে। তার মা একাই সংসার সামলাতে হিমশিম খেতেন, আর কলি, তার নাজুক কাঁধে দায়িত্বের ভার অনুভব করতে থাকে। এতসব সমস্যা কারণে তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। কলি তার পরিবারকে সাহায্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার বয়সে সেই সুযোগ খুব কমই ছিল।
এই কঠিন বছরগুলোতে কলি মুক্তি কক্সবাজারের জিবিভিআইই প্রকল্প-পরিচালিত উইমেন-ফ্রেন্ডলি স্পেস (ডব্লিউএফএস)-এ আসে। শুরুতে সে শুধু বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে আসত, কিন্তু শীঘ্রই সে প্রকল্পের সচেতনতামূলক অধিবেশন, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা (পিএসএস) সভা এবং অন্যান্য কার্যক্রমে অংশ নিতে শুরু করে। ধাপে ধাপে সে নারীর অধিকার, যোগাযোগের দক্ষতা এবং মানসিক চাপ ও প্রতিকূলতা মোকাবেলার উপায়সমূহ সম্পর্কে জানতে শুরু করে। প্রতিটি অধিবেশন তাকে আত্মবিশ্বাস যোগায় এবং সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার নিজের জীবনেও তার মতামত থাকতে পারে।
যখন একটি এনজিওতে WASH স্বেচ্ছাসেবকের পদ খালি হলো, কলি আবেদন করলো এবং সেখানে প্রায় দেড় বছর কাজ করলো। দুর্ভাগ্যবশত, তহবিল সংকটের কারণে প্রোগ্রামটি বন্ধ হয়ে যায় এবং কলি তার চাকরি হারায়। সে হতাশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত বোধ করলেও হাল ছাড়েনি। সে WFS-এ যাওয়া, বিভিন্ন অধিবেশনে অংশগ্রহণ করা এবং তার গড়ে তোলা সহায়তা নেটওয়ার্কের সাথে নিয়িমিতভাবে যোগাযোগ অব্যাহত রাখলো।
তার সমস্যা এখানেই শেষ হয়নি। কলির মা চাইতেন সে বিয়ে করুক, যার অর্থ ছিল তার কাজ এবং যে স্বাধীনতা সে অর্জন করতে শুরু করেছিল তা ছেড়ে দেওয়া। অসহায় ও হতাশ কলি তার উদ্বেগের কথা WFS-এর একজন কেস ওয়ার্কারকে জানাল। তিনি কলির সাথে নিয়মিত দেখা করতেন, কলির উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করতেন এবং বিভিন্ন বিকল্প উপায় দেখাতেন। ধীরে ধীরে, কলির মা তার মেয়ের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার গুরুত্ব বুঝতে শুরু করলেন। একদিন তিনি কলিকে বললেন, “আমি তোমাকে বিয়ে করতে জোর করব না।” সেই সিদ্ধান্তটি কলির জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
এর কিছুদিন পরেই, WFS-এ PSS স্বেচ্ছাসেবকের একটি পদ খালি হয়। কলি তাতে আবেদন করে এবং নির্বাচিত হয়। সে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধের উপর প্রশিক্ষণ লাভ করে। বর্তমানে, সে তার কমিউনিটির নারী ও মেয়েদের জন্য সেশন পরিচালনা করে, যেখানে তাদের মানসিক চাপ সামলাতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবার পথ দেখায়। ক্যাম্পে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া অনেক তরুণীর জন্য সে পথনির্দেশনা ও আশার উৎস হয়ে উঠেছে।
ধীরে ধীরে কলির পরিবার তার কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে এবং তার ছোট বোন তার দৃষ্টান্ত থেকে অনুপ্রাণিত হয়। এছাড়াও, কমিউনিটির মেয়েরা এখন তাকে অনুসরনীয় মনে করে এবং যখন তারা মানসিক চাপে থাকে বা সহিংসতার শিকার হয়, তখন প্রায়ই তার কাছে পরামর্শ নিতে আসে। কলি তাদের কথা শোনে, উৎসাহিত করে এবং তাদের WFS-এর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়, যাতে তারা প্রয়োজনীয় সাহায্য পেতে পারে।
আনোয়ার কলি বলেন, “আগে আমি সাহায্য চাইতাম। এখন আমি অন্যদের সাহায্য করি। আমি শিখেছি যে আমার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার আছে। আজ আমার কমিউনিটির অনেক মেয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে আমার কাছে আসে। আমি তাদের কথা শুনি এবং WFS থেকে সহায়তা পাওয়ার জন্য তাদের পথ দেখাই। এটা জেনে আমার গর্ব হয় যে আমার গল্প অন্যদের আশা ও আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে।”
কালা পুতুর অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা!
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে বেড়ে ওঠা তরুণদের জীবন প্রায়ই অনিশ্চয়তা, সীমিত সুযোগ এবং গভীর সামাজিক বাধার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। ক্যাম্প-১৯ এর ২৩ বছর বয়সী বাসিন্দা কালা পুতুর জন্যও একসময় এই বাস্তবতা ছিল ভয়, শিক্ষার অভাব এবং বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে সীমাবদ্ধ একটি জীবন। কিন্তু আজ তার গল্প ভিন্ন—সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং পরিবর্তনের গল্প।
কালা পুতুর এই পরিবর্তনের সূচনা হয় যখন সে UNFPA-এর সহায়তায় মুক্তি কক্সবাজারের “Youth for Peace” উদ্যোগে যোগ দেয়। Adolescent and Youth Center-এর মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করা এবং নেতৃত্বের দক্ষতা গড়ে তোলার সে একটি নিরাপদ পরিবেশ পায়। প্রথমদিকে, সে দলীয় আলোচনায় কথা বলতে দ্বিধা বোধ করত। কিন্তু লাইফ-স্কিল সেশন, ইন্টারেক্টিভ লেসন এবং নাটক ও কমিউনিটি ডায়ালগের মতো দলীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। সে লিঙ্গসমতা, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, এবং বাল্যবিবাহের মতো ক্ষতিকর প্রথার প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারে।
আজ কালা পুতু আর নীরব দর্শক নয়—সে একজন যুব স্বেচ্ছাসেবক, যে তার সম্প্রদায়ে সচেতনতা সেশন পরিচালনা করে। সে সহপাঠী, পরিবার এবং কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করে, তাদের ক্ষতিকর সামাজিক ধারণা পুনর্বিবেচনা করতে এবং ইতিবাচক পরিবর্তনে উৎসাহিত করে। স্ব বলে, “আগে আমি অন্যদের সামনে কথা বলতে ভয় পেতাম, এখন আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষা, সম্মান এবং বাল্যবিবাহ বন্ধ করার বিষয়ে কথা বলতে পারি।”
তার এই যাত্রা “Youth for Peace” উদ্যোগের বৃহত্তর প্রভাবকে তুলে ধরে। সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে এই কর্মসূচি তরুণদের সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে এবং নেতৃত্বগ্রহণে সক্ষম করে। ইতোমধ্যে এই যুব-নেতৃত্বাধীন কার্যক্রম ক্যাম্প-১৯-এর অনেক মানুষের কাছে পৌঁছেছে, যা সংলাপ বৃদ্ধি, আস্থা গড়ে তোলা এবং লিঙ্গসমতা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও সামাজিক রীতিনীতির মতো চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, এই কর্মসূচি কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, অভিভাবক এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি তরুণদের কণ্ঠস্বর এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে।
এই উদ্যোগের সাফল্য UNFPA, মুক্তি কক্সবাজার এবং কমিউনিটির অংশীদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার শক্তিকে তুলে ধরে। তারা একসঙ্গে নিশ্চিত করছে যে তরুণরা শুধু শোনা যাচ্ছে না, বরং নিজেদের কমিউনিটি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।